পর্দার ওপারে যার একটা হুঙ্কারে হল জুড়ে পিন পড়লে শব্দ শোনা যেত, বাস্তবের মৃত্যুর কাছে তিনি আজ বড়ই শান্ত। বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ায় আচমকা চিরঘুমে পাড়ি দিলেন পদ্মশ্রী নানা পাটেকর।
গোয়ায় নিজ বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে চিরবিদায় নিয়েছেন তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই প্রবীণ নক্ষত্র।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, প্রবীণ অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নানা পাটেকর গোয়ায় নিজ বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) হয়ে মারা যান। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে নিয়ে আসার পর প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তাঁর শরীর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
গল্পটা শুরু হয়েছিল মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জাঞ্জিরায়। বাবা নাম রেখেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। কিন্তু দুনিয়া তাঁকে চিনল ‘নানা পাটেকর’ নামে। মারাঠি থিয়েটারের কিংবদন্তি বিজয়া মেহতার হাত ধরে তাঁর অভিনয়ে হাতেখড়ি। তবে এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের পেছনের রাস্তাটা মোটেই মসৃণ ছিল না। চরম দারিদ্র্য। জে জে স্কুল অফ আর্টসে পড়ার সময় পেটের দায়ে মুম্বাইয়ের রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকেছেন। সিনেমার পোস্টার এঁকে দিন গুজরান করেছেন। আঘাত এসেছে ব্যক্তিগত জীবনেও। মাত্র ২৮ বছর বয়সে বাবাকে হারান। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা পান, যখন নিজের চোখের সামনে দেখেন দু’বছরের আদরের সন্তান দুর্বাসার মৃত্যু। একটা বাবার কাছে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে! স্ত্রী নীলকান্তি পাটেকরের সঙ্গে দাম্পত্যে পরবর্তীকালে দূরত্ব তৈরি হলেও, আজীবন তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান অটুট ছিল। এত শোক, এত কান্না বুকে চেপেও তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি। বরং নিজের ভেতরের সবটুকু যন্ত্রণা ঢেলে দিয়েছিলেন অভিনয়ের পর্দায়। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবি দিয়ে শুরু। তারপর আর তাঁকে কখনও পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নানা পাটেকর নাটসম্রাট, ওয়াজুদ, পরিন্দা, আব তাক ছাপ্পান এবং যশবন্তসহ আরও অনেক চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়ের জন্য পরিচিত। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে শক্তি: দ্য পাওয়ার(২০০২), আব তাক ছাপ্পান (২০০৪), অপহরণ (২০০৫) এবং ট্যাক্সি নং–৯২১১ (২০০৬) ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রশংসিত হন। ওয়েলকাম (২০০৭) কমেডি ছবিতে এবং এর পরবর্তী পর্ব ওয়েলকাম ব্যাক (২০১৫)-এ গ্যাংস্টার ‘উদয় শেটঠি’ চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান।
নানা পাটেকর কমেডি থ্রিলার ‘হাউসফুল ৫’-এও পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তিনি রাজনৈতিক থ্রিলার ‘রাজনীতি’ (২০১০) সিনেমারও অংশ ছিলেন—যেটির জন্য তিনি সেরা পার্শ্ব অভিনেতার জন্য পঞ্চম ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের মনোনয়ন পান। ২০১৬ সালে মারাঠি চলচ্চিত্র ‘নাটসম্রাট’-এ দারুণ অভিনয়ের জন্য তিনি সেরা অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতে নেন।
তিনি ‘যশবন্ত’ (১৯৯৭), ‘ওয়াজুদ’ (১৯৯৮) এবং ‘আঞ্চ’ (২০০৩) সিনেমাগুলোতে নেপথ্য গায়ক হিসেবে গান গাওয়ার জন্যও পরিচিত ছিলেন।
অভিনয়ে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি, চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, দুটি মহারাষ্ট্র রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং একটি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস মারাঠি লাভ করেন। সিনেমা ও শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০১৩ সালে তিনি পদ্মশ্রী সম্মানেও ভূষিত হন।
১৯৮৮ সালে অস্কারে মনোনীত ‘সালাম বোম্বে’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করার পর, এই প্রবীণ অভিনেতা ১৯৮৯ সালের অপরাধভিত্তিক নাট্যধর্মী সিনেমা ‘পরিন্দা’তে দারুণ পারফর্ম্যান্সের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন।
নানা পাটেকর টেরিটোরিয়াল আর্মি (আঞ্চলিক সেনাবাহিনী)’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৮৮ সালে ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন এবং তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’—এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিন বছর সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ভি কে সিংয়ের সাথে কাজ করেছিলেন, যিনি সেই সিনেমাটিতেও অভিনয় করেছিলেন।
সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে তাঁর এই পথচলা কেবল সিনেমার প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময় তিনি মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সাথে মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । পরবর্তীতে তিনি ২০১৩ সালে টেরিটোরিয়াল আর্মি থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।